অধ্যায় ১ — সুশিক্ষিত সংসার
কলকাতার সকালবেলায় এক ধরনের শৃঙ্খলা আছে।
রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে কেটলির ঢাকনা টুংটাং করে, বাসের ব্রেক কেঁদে ওঠে, দূরে কারও বারান্দা থেকে জল পড়ে—সব মিলিয়ে যেন শহর ধীরে ধীরে নিজের দেহে প্রাণ ফেরায়। তবু বহুতলের উপরের দিকের ফ্ল্যাটগুলোয় এই জাগরণ কিছুটা অন্যরকম। সেখানে সকাল নেমে আসে শব্দহীন, কাচের জানলা বেয়ে আলো গড়িয়ে পড়ে; যেন শহর থেকে সামান্য দূরে, অথচ শহরের মধ্যেই।
দক্ষিণ কলকাতার একটি নতুন আবাসনের বারোতলার ফ্ল্যাটে ঐশী আয়নার সামনে বসে ছিল। ফ্ল্যাটের নাম বসুন্ধরা।
আয়নার সামনে সে চুল বেঁধে নিচ্ছে। কানের দুল পরছে। পাশের টেবিলে ফোনটা উল্টো করে রাখা। স্ক্রিন জ্বলছে নিভছে, কিন্তু সে দেখছে না।
আয়না মানুষের মুখ খুব বিশ্বস্তভাবে ধরে রাখে।
কিন্তু ক্লান্তি ধরে রাখতে পারে না।
ঐশীর মুখে ক্লান্তি ছিল না। অন্তত বাইরে থেকে নয়। সুগঠিত মুখ, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে নিয়ন্ত্রিত স্থিরতা—যে স্থিরতা দীর্ঘ অভ্যাসে অর্জিত।
ঘরের দরজায় এসে ঋতম দাঁড়াল।
হাতে coffee mug। সদ্য স্নান করা। চুল ভেজা। পরিপাটি।
ঋতমকে দেখলে প্রথমেই একটা কথা মনে হয়—লোকটি ভদ্র।
তার গলায় কখনও চড়া সুর ওঠে না। সে কাউকে অপমান করে কথা বলে না। বাড়ির কাজেও হাত লাগায়। বাইরে থেকে দেখলে আদর্শ স্বামী বলতেই হয়।
ঐশী আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখেই বলল—
—কিছু বলবে?
ঋতম মগে চুমুক দিয়ে বলল—
—আজ ফিরতে দেরি?
—হ্যাঁ। Singapore client call আছে।
—রাতে?
—হ্যাঁ, dinner-এর পরও stretch করতে পারে।
ঋতম একটু থামল।
—হুম।
একটা মাত্র শব্দ।
কিন্তু বহু বছরের দাম্পত্যে মানুষ শিখে যায়—একটি শব্দও কখনও সম্পূর্ণ বাক্যের কাজ করে।
ঐশী দুলটা ঠিক করতে করতে বলল—
—কী?
—কিছু না।
“কিছু না”—বাংলা ভাষার সবচেয়ে ব্যবহৃত এবং সবচেয়ে অসত্য বাক্যগুলোর একটি।
ঐশী এবার ঘুরে তাকাল।
—বল।
ঋতম মৃদু হেসে বলল—
—না, আমি তো কিছু বলছি না। তোমার কাজ important, I know.
বাক্যটিতে আপত্তিকর কিছু ছিল না।
বরং প্রশংসা বলেই শোনায়।
তবু ঐশীর বুকের ভিতরে কোথাও হালকা একটা টান লাগল।
এই টান নতুন নয়।
বরং পুরোনো—এত পুরোনো যে, শরীর তাকে চেনে, কিন্তু ভাষা এখনো পুরো শিখে ওঠেনি।
ঐশী ধীরে বলল—
—তুমি upset?
—না তো।
—Sure?
ঋতম এবার একটু হেসে মাথা নাড়ল।
—ঐশী, তোমার একটা সমস্যা জানো?
—কি?
—তুমি সবকিছুকে overread করো।
ঐশী চুপ করে রইল।
এই অভিযোগটাও নতুন নয়।
যখনই সে কোনো অস্বস্তির উৎস ধরতে চেয়েছে, প্রায়শই এই উত্তর পেয়েছে—
“তুমি বেশি ভাবছ।”
বেশি ভাবা কি দোষ?
হয়তো।
আবার হয়তো, যাদের অনুভূতি সূক্ষ্ম, তাদের ভাগ্যেই এই অভিযোগ লেখা থাকে।
ঐশী ব্যাগ তুলল।
দরজার কাছে এসে জুতো পরতে পরতে বলল—
—আজ হয়তো late night হবে। খেয়ে নিও।
ঋতম শান্ত গলায় বলল—
—অবশ্যই। আমি তো manage করে নেব।
আবারও বাক্যে সমস্যা নেই।
তবু কোথাও একটা সূক্ষ্ম খোঁচা।
যেন বাক্যের ভিতরে আরেকটি বাক্য লুকিয়ে আছে।
“তুমি না থাকলেও আমি manage করি।”
“তোমার absence-ও আমার burden।”
ঐশী উঠে দাঁড়াল।
দরজার handle-এ হাত রেখেও থেমে গেল।
হঠাৎ বলল—
—ঋতম?
—হ্যাঁ?
—একটা কথা বলি?
—বল।
ঐশী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তুমি কখনও আমাকে directly কিছু করতে মানা করো না।
ঋতম ভ্রু কুঁচকাল।
—Because I respect you.
—জানি।
ঐশী ধীরে বলল—
—কিন্তু কখনও কখনও… তুমি এমন একটা পরিবেশ তৈরি করো, যেখানে আমার নিজের decision-এর জন্য guilty লাগে।
কথাটা বলেই ঘর যেন একটু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ঋতম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
—That’s unfair.
ঐশী নরম স্বরে বলল—
—হয়তো।
—আমি তো শুধু আমার feelings বলি।
ঐশী মাথা নাড়ল।
—জানি।
তারপর থামল।
শব্দ বেছে নিল।
কিছু কথা একবার বললে আর ফেরানো যায় না।
—অনেক পুরুষ control করে আদেশ দিয়ে।
ঋতমের চোখ স্থির।
ঐশী বলল—
—আরও কিছু পুরুষ control করে নিজের কষ্ট দেখিয়ে।
নীরবতা।
ঋতমের ঠোঁট শক্ত হয়ে এল।
—Wow.
শুধু এইটুকু।
রাগেরও স্তর আছে।
যারা সহজে চিৎকার করে, তাদের রাগ দৃশ্যমান।
যারা চিৎকার করে না, তাদের রাগ নীরবতায় জমে।
আর নীরব রাগ প্রায়ই বেশি ধারালো।
ঐশী আর কিছু বলল না।
দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
Lift-এর ভিতর আয়না ছিল।
ঐশী নিজের মুখের দিকে তাকাল।
অদ্ভুত।
মুহূর্তখানেক আগেও সে নিজেকে যথেষ্ট composed মনে করছিল।
এখন মনে হচ্ছে, চোখ দুটো যেন সামান্য ক্লান্ত।
সে হঠাৎ ভাবল—শেষ কবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে কাউকে explain করেনি?
মনে পড়ল না।
ছোট ছোট জিনিস:
নতুন ফোন কিনবে।
বন্ধুর সঙ্গে dinner-এ যাবে।
Late ফিরবে।
একলা weekend trip।
সবকিছুর আগে explanation।
অনুমতি নয়।
সে কখনও অনুমতি চায় না।
তবু—
Explain করে।
কেন?
Lift নিচে নামছিল।
১২।
১১।
১০।
ঐশীর মনে হল, মানুষকে বন্দি রাখার জন্য সবসময় শিকল লাগে না।
কখনও কখনও অভ্যাসই যথেষ্ট।
অফিসে পৌঁছতেই ব্যস্ততা তাকে গিলে ফেলল।
Meeting, drafting, negotiation, mails.
Corporate law এমন এক পেশা যেখানে মানুষ অন্যের conflict সমাধান করতে করতে নিজের conflict postpone করতে শিখে যায়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
ঐশী conference room থেকে বেরোতেই ফোন vibrate করল।
Screen-এ নাম।
নীহারিকা Calling
ঐশীর ঠোঁটে অনিচ্ছুক হাসি ফুটল।
কল ধরতেই ওপার থেকে—
—বেঁচে আছিস?
—কষ্টে।
—Corporate slavery চলছে?
—চলছেই।
নীহারিকা হেসে উঠল।
ঐশী আর নীহারিকা কলেজ-বন্ধু।
দুজনের জীবন একদম আলাদা পথে গেছে।
ঐশী নিয়মের ভিতর দিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে।
নীহারিকা নিয়ম ভেঙে নিজের পথ বানিয়েছে।
Writer.
Unmarried.
নিজের মতো।
লোকের ভাষায়—
“অতিরিক্ত স্বাধীন।”
এই “অতিরিক্ত” শব্দটা নীহারিকার খুব প্রিয়।
সে বলে—
“যে সমাজ স্বাধীনতাকে quantity-তে মাপে, সে সমাজ স্বাধীন নয়।”
ফোনে নীহারিকা বলল—
—আজ সন্ধ্যায় free?
ঐশী হেসে বলল—
—না।
—স্বামী?
—না, client।
—দুটোই প্রায় same.
ঐশী হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর স্বতঃস্ফূর্ত হাসি।
নীহারিকা একটু চুপ করে থেকে বলল—
—কী হয়েছে?
ঐশী থমকাল।
—কেন?
—তোর হাসির পরের নীরবতা আমি চিনি।
ঐশী কিছু বলল না।
নীহারিকা বলল—
—ঋতম?
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর ঐশী খুব আস্তে বলল—
—আমার কি মনে হয় জানিস?
—কি?
—ও কখনও আমায় কিছু করতে বাধা দেয় না।
—হুম।
—তবু… আমি যেন সব explain করি।
ওপার থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল না।
তারপর নীহারিকা বলল—
—তুই permission চাইছিস না।
ঐশী ধীরে বলল—
—তাহলে?
—তুই conflict avoid করছিস।
ঐশী স্থির হয়ে গেল।
বাক্যটা ছোট।
কিন্তু যেন ভিতরে কোথাও গিয়ে আঘাত করল।
—মানে?
নীহারিকা শান্ত গলায় বলল—
—যে সম্পর্কের মধ্যে disagreement safe নয়, সেখানে মানুষ permission চায় না।
সে conflict minimize করে।
ঐশী কিছু বলতে পারল না।
Conference room-এর কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল।
পরিপাটি। সফল। composed.
কেউ দেখে বলবে না, এই নারী এখন নিজের জীবনের একটা মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে।
নীহারিকা আবার বলল—
—ঐশী?
—হ্যাঁ?
—একটা প্রশ্ন করব?
—কর।
—তুই নিজের decision নিলে, ও রাগ করবে—এই ভয় বেশি?
না, ও কষ্ট পাবে—এই ভয় বেশি?
ঐশী চোখ বন্ধ করল।
উত্তরটা সঙ্গে সঙ্গে এল।
এবং উত্তরটি তাকে নিজেকেই ভয় পাইয়ে দিল।
—ও কষ্ট পাবে।
—Exactly.
নীহারিকা ধীরে বলল—
—অনেক educated পুরুষ command করে না।
তারা guilt তৈরি করে।
ঐশীর বুকের ভিতর কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
কারণ কথাটা নতুন নয়।
নতুন হল—
আজ সে প্রথমবার কথাটাকে অস্বীকার করতে পারল না।
রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই সে বুঝল ঋতম জেগে আছে।
Living room-এ lamp জ্বলছে।
ঋতম বই খুলে বসে আছে।
কিন্তু পড়ছে না।
ঐশী ব্যাগ নামাল।
—খেয়েছ?
—হ্যাঁ।
—Good.
ঋতম বই বন্ধ করল।
—আজ একটা কথা বুঝলাম।
ঐশীর বুক ধক করে উঠল।
—কি?
ঋতম তাকাল।
চোখে রাগ নেই।
যা আছে, তা আরও জটিল।
আঘাত।
—তুমি আমাকে খুব খারাপ ভাবে দেখো।
ঐশী স্তব্ধ।
—আমি তা বলিনি।
—বলোনি। কিন্তু imply করেছ।
ঐশী ধীরে বসে পড়ল।
ঋতম বলল—
—তোমার কাছে আমি কি? Manipulative husband?
ঐশী অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর বলল—
—আমি এখনও answer খুঁজছি।
ঋতমের মুখ শক্ত হল।
—Interesting.
আবার silence।
ঐশী হঠাৎ বুঝল—
কিছু কিছু সম্পর্ক ভাঙতে চিৎকার লাগে না।
দুইজন মানুষ যথেষ্ট শিক্ষিত হলে, যথেষ্ট ভদ্র হলে—
তারা অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় একে অপরকে আঘাত করতে পারে।
এবং সেই আঘাত আরও গভীর হয়।
ঋতম উঠে দাঁড়াল।
—Good night.
ঐশী তাকিয়ে রইল।
লোকটি সত্যিই খারাপ?
সে নিশ্চিত নয়।
হয়তো নয়।
হয়তো সমস্যাটা আরও সূক্ষ্ম।
হয়তো ঋতম তাকে বন্দি করতে চায় না।
হয়তো সে শুধু চায়—
ঐশীর স্বাধীনতা এমন জায়গায় শেষ হোক, যেখানে তার নিজের অস্বস্তি শুরু হয়।
এবং মানুষ প্রায়ই এটাকেই ভালোবাসা ভাবে।
ঐশী lamp নিভিয়ে শোবার ঘরে ঢুকল।
ঘুম এল না।
রাত গভীর হল।
পাশে ঋতম ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিয়মিত শ্বাস।
শান্ত মুখ।
এই মানুষটিকেই সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল।
তবু আজ মনে হচ্ছে—
সে যেন এই মানুষটিকে সম্পূর্ণ চেনে না।
হয়তো আরও ভয়ঙ্কর সত্য হল—
সে নিজেকেও সম্পূর্ণ চেনে না।
ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটি প্রশ্ন তার মনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
প্রশ্নটি এত সরল যে, তার জন্য কোনো দর্শন লাগে না।
শুধু সততা লাগে।
আমি কি স্বাধীন?
ঐশী উত্তর দিল না।
কারণ সে জানে—
কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া মানেই অজ্ঞতা নয়।
কখনও কখনও উত্তর জানা থাকে।
শুধু উচ্চারণ করার সাহস থাকে না।